আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যান কিংবা আত্মগোপনে চলে যান। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই কুড়িগ্রামে ভিন্নধর্মী এক ঘটনা নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কুড়িগ্রাম পৌর আওয়ামী লীগের ত্রাণ, দুর্যোগ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ তাজুল ইসলামকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় সচেতন মহল, ছাত্র-জনতা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি জনসমক্ষে আসা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য তালিকা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত ২ জুন ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত ওই তালিকার ১৬ নম্বর ক্রমিকে “কমিটি কর্তৃক মনোনীত” সদস্য হিসেবে মোঃ তাজুল ইসলামের নাম উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত সময়ে তাজুল ইসলাম আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কমিটি থেকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বা দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেলেও, কুড়িগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে একজন পৌর আওয়ামী লীগ নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যখাতে দলীয় প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সেই প্রত্যাশা ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকাটি তত্ত্বাবধায়ক ও সদস্য সচিব ডাঃ মোঃ নূর নেওয়াজ আহমেদ স্বাক্ষর করেন। তালিকায় সভাপতি হিসেবে রয়েছেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ডঃ মোঃ আতিকুর রহমান মোজাহিদ। একই তালিকার ১৬ নম্বর সিরিয়ালে রাখা হয়েছে পৌর আওয়ামী লীগের এই নেতাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ছাত্র প্রতিনিধি বলেন, “আমরা যখন কুড়িগ্রামের স্বাস্থ্যখাতকে দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করার জন্য কাজ করছি, তখন পেছনের দরজা দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত এই বিতর্কিত তালিকা সংশোধন না করে এবং তাজুল ইসলামকে কমিটি থেকে বাদ না দেয়, তাহলে ছাত্র-জনতা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।”
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ নূর নেওয়াজ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এই কমিটি গঠন যে হইছে, এইগুলা সব এমপি মহোদয় করছে, এখানে আমার কোনো হাত নাই। উনি ঢুকাইয়া উনি এইগুলা করছে। আমি একজন কাঠের পুতুল।”
তিনি আরও বলেন, “উনিই সর্বেসর্বা। সভাপতি যা করবেন তাই তো হবে। সভাপতির বাইরে আমি যাইতে পারব?”
হাসপাতালের উন্নয়ন, সেবার মান বৃদ্ধি এবং রোগীদের জন্য একটি জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ ধরনের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সাধারণত স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং গ্রহণযোগ্য নাগরিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার রেওয়াজ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কমিটিতে অভিজ্ঞ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাখা হলে হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়, সেবার মান উন্নত হয় এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সহজ হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ নূর নেওয়াজ আহমেদ বলেন, “আমি এই ক্রাইটেরিয়া নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। উনি যেটা সিদ্ধান্ত দিছে, আমরা ওইভাবে প্রিন্ট করে পাঠাইছি।”
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটি সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটি শুধু আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো নয়; বরং এটি হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, অনিয়ম প্রতিরোধ, রোগীদের ভোগান্তি কমানো এবং উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে কারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা, সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বাস্থ্যখাত সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় হাসপাতালের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনআস্থার জায়গাটি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ ঘটনায় কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে যোগ্য, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।